সাগরদাড়ি

সাগরদাড়ি,Jashore

ঐতিহাসিক স্থানসমূহ

অনিমার সাথে যখন শেষবার দেখা হয়েছিল তখন রাত। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। যশোর টাউনহল মাঠে উদীচীর দ্বাদশ সম্মেলন চলছে। মঞ্চে শিল্পীরা গান পরিবেশন করেছে, পেছনের গ্রীনরুমে চলছে অনেকরকম প্রস্তুতি। অনেক শিল্পীদের সাথে আমিও তখন মঞ্চের পেছনে গ্রীন রুমে দাড়িয়ে আছি। সেখানেই অনিমার সাথে প্রথম পরিচয়। অনিমা আমেরিকান নাগরিক। বহুদিন থেকে বাংলাদেশে আছে। ভাঙা-ভাঙা উচ্চারণে বাংলা বলতে পারে। বাংলাদেশের সাহিত্য-সাংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে প্রচন্ড রকমের ভালোবাসে সেটা অনুমান করেছিলাম ওর নিপুণ শাড়ি পর আর বাঙালীয়ানা দেখে। কিছুক্ষণের মধ্যে ওর সাথে আলাপ জমে উঠলো। অধুনিক বাংলা গান সম্পর্কে ওর অভিমত হচ্ছে, ‘আমি আর তুমিতেই গানগুলো সীমাবদ্ধ’। আলাপ চারিতার একসময় আধুনিক বাংলা কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই ওর মুখ বাংলা পাঁচের এর মতো হয়ে গেল, বলল, আধুনিক কবিতা! আনিমার সরল অভিব্যাক্তি, আমি আধুনিক কবিতা খুব একটা ভালো বুঝিনা, জটিল মনে হয়, জটিল মনে হয়, আর প্রেমের কবিতার বাইরে খুব একটি কবিতা পাওয়া যায় না। আমি ওর মতো প্রতিত্তর দিয়ে বললাম, অনেক ভালো কবিতাতো এখন লেখা হচ্ছে.... । তারপর বললো আজ ও সাগারদাঁড়ি মাইকেল মধুসুদনের ভিটে বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলো। ওর অনেক দিনের ইচ্ছে কবি ভিটে দেখার। খুব ভালো লেগেছে! দু’পাশের চমৎকার অবারিত ফসলের মাঠ, পথের দুধারে মাথার উপর নিপূণ ছায়া হয়ে থাকা গাছ গুলো ওর মনে ফাগুনের দোলা জাগিয়ে ছিলো। এক ধরনের গাছ ওর কাছে খুব আশ্চার্য লেগেছে যাতে সারা গাছ ভর্তি লাল লাল ফুল অথচ কোন পাতা নেই। আমাকে জিজ্ঞাসা করলো গাছটির নাম বলতে পারো? এক মুহুর্ত চিন্তা করে বললাম, ওটি শিমুল গাছ। অনিমা খুব মজা পেয়েছিল। আসলেই এই চমৎকার ব্যাপারটি এভাবে আমারো কখনো ভাবা হয়নি, ”সমস্ত গাছ ভর্তি ফুল অথচ কোন পাতা নেই!”

কিভাবে যাবেন:

আধুনিক বাংলা কবিতার জনক, বাংলা অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবক্তা, প্রথা বিরোধী ধারার প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের পৈত্রিক বাসভূমি যশোর কেশবপুরের সাগরদাঁড়িতে।

যশোর শহরের কেন্দ্রীয় বাস টারমিনাল থেকে বাসে চেপে সোজা কেশবপুর, প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ সেখান থেকে একটু সামনে গিয়ে ডান দিকে গ্রামীন পথ বেয়ে পিচ রাস্তা চলে গেছে সাগরদাঁড়ি, কবি মাইকেল মাইকেল মধুসূদনের পৈত্রিক ভিটা। নসিমন (স্যালো মেশিন চালিত স্থানীয় যান) বা হেলিকাপ্টারে (যাত্রীবাহী মোটরসাইকেলের স্থানীয় নাম) চেপে কেশবপুর থেকে ২০/৩০ মিনিটের মধ্যে কবি ভিটায় পৌছানো যায়। অথবা যশোর শহর থেকে প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া যায় যা চেপে সরাসরি সাগরদাঁড়ি পৌছানো যায়। তবে নসিমনে চড়া খানিকটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও যাত্রাটি রিতিমতো রোমাঞ্চকর।কেশবপুর থেকে সাগরদাঁড়ি যাওয়ার পথে দুধারের মানোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য সহজেই মোহিত করে এটি গ্রাম বাংলার সেই চিরকালীন দৃশ্য। যদিও প্রাকৃতিক দূর্যোগ প্রায়ই হানা দেয় তবুই কৃষক থেমে নেই, এই দূর্যোগ মোকাবেলা করেই তারা তাদের ফষল ঘরে তোলে। রাস্তার দুধারে মাথায় ছাতার মতো আগলে আগলে আছে সারিসারি বাবলা, শিশু, শিমুল ও বিভিন্ন প্রজারিত গাছ। দুধারে বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠে সোনালী ফসলে দোল খায় হিমেল হাওয়া। সেই দোলানিতে নাগরিক মন দুলে উঠে। দূর থেকে কোথাও ভেসে আসে মাতাল সুরে বাঁশি। বাতাসের বুক চিরে ছুটে চলেছে গাড়ি। যেন কোন অদেখা আহ্বানে পৌছে দেবে নাগরিক মন। ফসল উঠে গেলেই শিতের শুরুতে এই মাঠে বোনা হবে সরিসা, আর ফুল ফুটলেই হলুদের সমারহ। গোটা প্রকৃতি যেন হলুদ শাড়ি পরে থাকে। এই ভয়ংকার সুন্দরের বর্ণনা লিখে বোঝানো যাবে না। কিছুদূর এগোলেই সরু খাল, দুকূলের মানুষের সেতু বন্ধনের মতো সেচের পরশ বোলায়। সেখান থেকে একটু দূরে ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে দাড়িয়ে আছে আঠারো শতকের দিকে নির্মিত তিন গম্বুজ মসজিদ। ১৮৩০ খৃষ্টাব্দে শিশু কবি এই মসজিদে আরবি ও ফারসী ভাষায় শিক্ষা লাভ করেন। কুমোর বাড়ির নিপুন ছোয়ায় কাঁদার দলা তৈরী হচ্ছে সুন্দর সব মৃতশিল্পে। এসব পেরিয়ে এক সময় পৌছে যাবেন কবি ভিটায়। ডান হাতে কবির প্রতিকৃতির সাথে খচিত ফলকে লেখা:

“দাঁড়াও পথিক বর জন্ম যদি তব বঙ্গে তিষ্ঠ ক্ষণকাল। এ সমাধিস্থলে (জননীর কোলে শিশুলভয়ে যেমতি বিরাম) মহীর-পদে মহানিদ্রাবৃত দত্ত কুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন। যশোরে সাগর দাঁড়ী কপতাক্ষ তীরে জন্ম ভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি রাজ নারায়ণ নামে জননী জাহ্নবী।“

সামনেই আছে সান বাধানো মস্তপুকুর। পুকুরের পাড়ে বিশাল আকৃতির কয়েকটি আম গাছ যার তলে বসে মন শীতল করে নিতে পারেন। সেখান থেকে পূর্ব পাশের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই কবির পারিবারিক দেবালয়, এক সময় পূজা পার্বণে বেঁজে উঠতো উলু-শঙ্খের ধ্বনি। অন্দর মহল সরগরম থাকতো উৎসবের আয়োজনে।তবে এখনো এখানে নিয়মিত দূগাপূজা হয়। দেবালয়ের বাম পাশে প্রত্যেক কক্ষে সাজানো আছে কবি পরিবারের ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও বিভিন্ন সামগ্রী। এর মধ্যে আছে: কারুকাজ খচিত একটি কাঠের বাক্স যা থেকে কবি পরিবারের সৌখিন রুচির সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। আছে একটি কুকুর মাথা গ্রামোফোন, একটি পাথরের পাত্র, টুপি রাখার পাত্র, একটি আলনা, একটি ছোট খাট ও টেবিল প্রভৃতি যা কবি পরিবারের ঐতিহ্য বহন করে। উত্তর দিকের শেষ মাথায় বেরিয়ে সামনে রয়েছে একটি তুলশী মঞ্চ, সেখানেই কবি জন্ম গ্রহণ করেন। পূর্ব পাশ্বে আছে একটি দ্বিতল ভবন যেটি কবির কাকার বাড়ি। ভেতর বাড়িতে আছে আরেকটি সান বাধানো পুকুর। বিভিন্ন গাছ-গাছালির শ্যামল ঘন ছায়া তার সবটুকু দরদ নিংড়ে যেন আসন পেতে দিচ্ছে কবি ভিটায়।

কবি ভবন থেকে বেরিয়ে রাস্তার দুধারে কবিবাড়ি কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ছোট-খাটো বাজার। পাশেই রয়েছে মধুসূদন একাডেমি। হাতের বামে বাজারের পেছনে মস্ত খোলা মাঠ সেখানেই প্রতি বছর কবির জন্ম বার্ষকীতে যশোর জেলা প্রশাসন ও শিল্পকলার উদ্দ্যেগে চলে “মধুমেলা”। তখন জমে উঠে প্রাণের পরশ। গোটা সাগরদাঁড়িই যেন উৎসবে মেতে উঠে। মাঠ ভর্তি ছোট ছোট দোকান, মৃতশিল্প, কারুশিল্প, মন্ডা-মেঠাই, খেলনা, ভেঁপু বাশি, সোপিচ, পোস্টার, মেয়েদের প্রয়োজনীয় গৃহ ও প্রসাধন সামগ্রী, আছে মজার সার্কাস আর সারারাত ব্যাপি চলে যাত্রাপালা তখন হরেক রকম প্রমোদে মেতে ওঠে সাগরদাঁড়ি।

অন্যদিকে মঞ্চে আবৃত্তি হয় কবির কবিতা, বিভন্ন ধরনের গান আর গুণীজনদের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে সাগরদাঁড়ি। অনেক লোকের সমাগম হয় দেশে-বিদেশ থেকে তখন বহু কবি ও দশনার্থী আসেন কবি ভিটে দেখার জন্য। তখন এই প্রাণের মেলা হয়ে ওঠে কবিদের এক তীর্থস্থান।

Courtesy by amarjessore.com

Share:

Language

District Wise Tourist Spot

Copyright © Htlbd.com 2019 | Version 1.0