সাল ২০০৮, কলেজে পড়ি, সবে টেস্ট পরীক্ষা শেষ করেছি। আমার বা বন্ধুদের কারো অবস্থাই খুব একটা সুবিধার না। এইচএসসি তো দূরে থাক, টেস্টে একটাতেও পাশ হবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু তা নিয়ে আমাদের খুব একটা মাথাব্যথা নাই। আমরা নিয়ম করে সন্ধ্যায় বনশ্রীর সি ব্লকে আড্ডা জমাই। আড্ডার বিষয় একটাই, এইচএসসি শেষ করে কোথায় ঘুড়তে যাবো। প্রথম থেকেই কক্সবাজার যাবার প্ল্যান। দুই টাকার লাল চা হাতে সেই ট্যুরের স্বপ্ন দেখে আমাদের দিনকাল ভালোই যাচ্ছে। পরীক্ষার কদিন আগে এক বড়ভাই বললো ৫ দিন কক্সবাজার থেকে কি করবি? আগে বান্দরবান যা, সেখানে দুইদিন থেকে তারপর কক্সবাজারে গেলি। বান্দরবান এ নাকি মহাজাগতিক স্বর্গীয় এক লেক আছে, বগা লেক। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সেই ভাইয়ের কথা ফেলার সামর্থ্য আমাদের নাই, গুরু মানি। কোন হিসাব ছাড়াই ধরে নিলাম বগা লেক যাচ্ছি।

পরীক্ষা শেষে প্র‍্যাক্টিকাল হলো সেটাও শেষ হলো। শেষ দিন ফ্রিতে ইউসিসি তে ভর্তি কোচিং এর লেকচার। সবাই মিলে গেলাম ফার্মগেটে পাটোয়ারী সাহেবের  মাগনা লেকচার শুনতে। উনি শুরুতেই বললেন, আমি জানি আপনারা এখন গায়ে হাওয়া লাগানোর ধান্দা করছেন, ঘুরতে যাবেন ভাবছেন। কিন্তু এই আড়াই মাস কোথাও যাওয়া যাবে না, নাক চোখ বুজে পড়তে হবে, একবার চান্স পেয়ে গেলে যত ইচ্ছা ঘুইরেন। বুঝলাম এই লোকের লেকচার আমাদের পোষাবে না। মাগনার সিংগারা সমুচা খেয়ে বের হয়ে গেলাম। সেদিন রাতেই যে আমরা বান্দরবান যাচ্ছি!

সবাই মিলে এক একজনের বাসায় গিয়ে মা দের অনুনয় বিনয় করে বুঝিয়ে একশটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অবশেষে ৮ জন রওনা দিলাম বগা লেকের পথে। সেই আমলে কলেজ পড়ুয়া খুব বেশি ছেলেপেলে বগা লেক যায়না। গুগল ম্যাপ নাই, স্মার্টফোনই তো নাই। বিন্দুমাত্র ধারনা ছাড়া প্রবল প্রানশক্তি নিয়ে পৌছালাম বান্দরবান। একে ওকে জিজ্ঞেস করে উঠলাম চান্দের গাড়িতে, গন্তব্য চিম্বুক। সেই প্রথম মেঘ আর পাহাড়ের মোহনীয়তা দেখা। চান্দের গাড়ির ছাদে যে অনুভূতি হচ্ছিলো সেটা সম্ভবত আর কোনদিনই হয়নি। চিম্বুক নেমে নৌকায় উঠলাম রুমার উদ্দেশ্যে, তখন রাস্তা ব্রিজ কিছুই হয়নি। সেই প্রথম সাংগু নদী দেখা। রুমায় গিয়ে একমাত্র আধভাঙ্গা হোটেলে রুম নিলাম। ওরা বললো আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে নাম লিখাতে। গেলাম, বললাম বগা লেক যাবো। আমাদের দেখে আর্মির এনসিও সাহেব হতবাক। ধমকের সুরে বললেন ফাইজলামি পাইছেন? আপনারা আসছেন বাসায় জানে? বগা লেক কিভাবে যায় জানেন? গাইড নিয়েছেন? আমরা আর্মির ধমকে ভ্যাবাচেকা খেয়ে চুপ হয়ে গেলাম। একটু পরে বুঝলাম এ যাত্রায় বগালেক যাওয়া হচ্ছে না। আফসোসটা বেশিক্ষণ টিকলো না, সবাই মিলে চলে গেলাম সাংগুর পাড়ে। সে রাতে আকাশের তারাগুলি সম্ভবত কাছে চলে এসেছিলো। সেই মহাজাগতিক দৃশ্য দেখার পরে আফসোসের সুযোগ কই?

এরপর বেশ কয়েকবারই গিয়েছি বান্দরবান। একটা সময় ল্যান্ডস্কেপ ছবি তোলা শুরু করেছি, ফলে বান্দরবান যাবার নেশার সাথে একটা অজুহাত যোগ হয়েছে। তবে ছবি কমই তুলতে পেরেছি, কারন ক্যামেরা হাতে নেয়ার ইচ্ছেটা আসেনি অধিকাংশ সময়, বুদ হয়ে ডুব দিয়েছি বান্দরবানের মেঘজাদুতে। এর পরেও যেসব ছবি তুলেছি তারই কয়েকটা নিয়ে এই এলবাম।

সত্যি বলতে এমন একটা এলবাম শেয়ার করতে পেরে নিজেই মুগ্ধ, নিজেই ছবিগুলোতে হারিয়ে যাই বারবার। আর এক একটা ছবি মনে করিয়ে দেয় অসম্ভব সুখময় এক স্মৃতি। এই এলবাম বান্দরবানের সব সৌন্দর্য তুলে ধরতে পারেনি। এখানে ঝর্না নেই, গহীনের গল্প নেই। পাটোয়ারী সাহেবের কথা আমি শুনি নাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে ইচ্ছামত ঘুরাও হয় নাই। আমি বেছে নিয়েছি অনেক শৃঙ্খল এক সামরিক বাহিনীর জীবন। ফলে চাইলেই হারিয়ে যেতে পারিনা নাফাকুম ফেলে অজানায়। তবুও এই ছবিগুলি বান্দরবান এর সৌন্দর্যকে অনেকটাই তুলে ধরেছে, আশা করি আপনাদেরকেও মুগ্ধ করবে।

Photo credit and story by Rakib Reza.